‘এটি কি সেই বিকল্প বাস্তবতা যেটি ঘটেইনি এখন পর্যন্ত?’

‘ক্ষমা’ এমন একটি শব্দ যেটি শুনতে মহান ও হিলিংয়ের মতো কিছু একটা মনে হয় যতক্ষণ না তোমার নিজেকে সেটি সত্যিই কখনো করতে হয়। নির্মম সত্য এই— কিছু আঘাত আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই থাকে যেটি কখনোই সময়ের সাথে মুছে যায় না। কিছু ক্ষত থাকে এমন  জেঁকে বসে থাকে বুকের গভীরে, প্রিয় বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহ স্মৃতি বারবার হাজির হয় চোখের সামনে। এসবের পরে যখন কেউ বলে, ‘ক্ষমা করে দাও। সামনে এগিয়ে যাও।’— তারা হয়তো পুরোটা জানে না কিন্তু এমন কি মনে হয় না তখন— ‘সামনে এগোবো? কোথায় সেই সম্মুখের পথ? এটি কি সেই বিকল্প বাস্তবতা যেটি ঘটেইনি এখন পর্যন্ত?’


                                                    ছবি: ইন্টারনেট। 

‘যা কখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় সেটিকে ক্ষমা করা’ বলতে জোর করে ক্ষমা করা বা ক্ষমা করে দেওয়ার ভান করা নয় যে, কিছুই ঘটেনি তেমন। এটি এমন— সেই কষ্টের ভেতর দিয়ে অনবরত হাঁটা কিন্তু সেটিকে কখনোই নিজের পরিচয়ের অংশ হতে না দেওয়া। এটি হিলিং হওয়ার একটি প্রক্রিয়া— কারো অনুতপ্ত হওয়ার আশায় বসে না থাকা যেটি কখনোই আসবে না। এটির মানে এই— বুঝতে পারা যে, কেবল ‘সব ঠিক আছে’ বলা নয় বরং বলা যে, ‘এটিকে আর কখনোই আমার নিজের ওপর কর্তৃত্ব করতে দেব না।’

লরেন্স— এক নাটকীয় কায়দায় যার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে সম্প্রতি, আমাকে শিখিয়েছে— ‘অতীতকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তোমার সংগ্রাম করে যাওয়া আবার মনের মধ্যে পুরনো ক্ষোভ পুষে রাখা যে, একদিন কোনো জরুরি মুহূর্তে সেটি খরচ করবে বলে ভেবে থাকো তাহলে আজই সেসব বন্ধ করো। বরং অনুসরণ করো ক্ষমা সম্পর্কিত মহান মনীষীদের শিক্ষা’— লরেন্সের শেখানো এই সাতটি শিক্ষা আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। প্রিয় বন্ধুকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সকলের জন্য এটি শেয়ার করলাম।

১. এটি ভাবার দরকার নেই যে, ক্ষমা করে দেওয়া মানে যা ঘটেছে তা ঠিক ছিল: আমাদের চারপাশের বেশিরভাগ মানুষ ক্ষমা করতে দ্বিধাবোধ করে কেননা তারা মনে করে, ক্ষমা করা মানে অতীতের ভুল-অন্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। লরেন্স আমাকে বুঝিয়েছে— ক্ষমা করা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। ঘটে যাওয়া ঘটনার ন্যায্যতা, সঠিকতা দেওয়ার জন্য ক্ষমা করা নয় বরং সেটির কারাগার থেকে নিজেকে মুক্ত করাই হলো ক্ষমা করে দেওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য। ক্ষমা করে দেওয়ার মানে তাদেরকে দায়মুক্ত করে দেওয়া নয় বরং সেই কারাগার থেকে, সেই কষ্ট বয়ে বেড়ানোর শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করা।

২. ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য কারো অনুতপ্ত হবার আকাঙ্ক্ষা মানে একই কারাগারে আটকে থাকা: আঘাতকারীরা তাদের ভুল বুঝে যদি দায় স্বীকার করত তাহলে ব্যাপারটা সহজ হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই— যারা ক্ষতি করে তারা কখনো সেটা বুঝতেই পারে না। যদি-বা বোঝেও তাদের দুঃখপ্রকাশ আমাদের কষ্ট মুছে ফেলার জন্য যথেষ্ট নয়। লরেন্স আমাকে শিখিয়েছে— হিলিং ব্যাপারটি অন্যদের দুঃখ প্রকাশের সাথে সম্পর্কিত নয়। নির্ভরও করে না তার ওপর। যদি এমন হয় যে, কেউ এসে সেই ক্ষত সারিয়ে দেবে বলে আমরা অপেক্ষা করছি তাহলে কেবল আটকে থাকাই হবে। এটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়— নিখুঁতভাবে এটি বলা নয় যে, দিলাম ক্ষমা করে।

৩. ক্ষমা আর বিশ্বাস এক নয়: ক্ষমার সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর একটি— এরপর কী করা উচিত সেটি বুঝতে পারা। সেইসব মানুষদের আবার জীবনে স্থান দেব? সম্পর্ক ঠিক করে নেব? নাকি একটি স্থায়ী সীমারেখা টেনে সামনে এগিয়ে যাব? লরেন্স আমাকে বলছিল যে— ক্ষমা করা হয় কিন্তু বিশ্বাস অর্জনের বিষয়। কাউকে ক্ষমা করে দেওয়ার মানে এই নয় যে, তাদেরকে আবার জীবনে স্থান দিতে হবে। ক্ষমা মূলত মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য, ইতোমধ্যে বন্ধ করে ফেলা দরজা পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য নয়।

৪. ক্ষতগুলো কখনোই জাদুর মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না, আর সেটিই স্বাভাবিক: ক্ষমা করে দেওয়া মানে ‍ভুলে যাওয়া নয়। জীবনে কিছু আঘাত এমন যা চিরকাল অনুভূত হবে। কিন্তু এটি কোনো ব্যর্থতার চিহ্ন নয় বরং এটি অনুধাবন করায় যে, আমরা মানুষ। হিলিংয়ের জার্নি বারবার বিশৃঙ্খল হতে পারে— কখনো মনে হবে আমরা মুক্ত; কখনো মনে হবে পুরনো ক্ষত জাগ্রত হয়েছে বুকের ভেতর, কখনো সেটি আঘাত হানবে প্রথমবারের ন্যায়, দগদগে হবে কখনো কখনো। ক্ষমা মানে এই নয় যে, তুমি আর কখনো কষ্ট অনুভব করবে না। এটির মানে এই— সেই কষ্টের মধ্যে আটকে থেকে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত না নেওয়া।

৫. বাউন্ডারি সেট করা মানে প্রতিশোধ নয়; আত্মসম্মানের প্রকাশ: ক্ষমা করা মানে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া নয়। বারবার আঘাত পাওয়ার চাইতে দূরে সরে আসা, সীমারেখা টেনে দেওয়ার অর্থ কোনো নিষ্ঠুরতা নয় বরং এটি আত্মসম্মানের প্রকাশ। লরেন্স আমাকে শিখিয়েছে, নিজেকে দোষী না ভেবেও নিজের বিকাশের জন্য সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি। কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এটি করা নয় বরং নিজের হৃদয়কে রক্ষার জন্য এটি জরুরি। ‘আঘাতকারীকে ক্ষমা করে দাও,’ লরেন্স বলছিল, তবে নিজেকে এটাও বলো যে, ‘নিজেকে ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি তাই এই আঘাত আর সহ্য করব না।’

৬. নিজের হিলিং তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল নয়: আমরা অনেকেই মনে করি, যদি সেই ব্যক্তি বদলে যেত, দায়িত্ব স্বীকার করত, বা অন্তত স্বীকার করত যে, তারা ভুল করেছে, তাহলে নিরাময় দ্রুত হতো। লরেন্স এটাকেও চ্যালেঞ্জ করল— ‘তোমার হিলিং আঘাতকারীর হাতে নয়।’ সামনে এগিয়ে যাওয়া, শান্তি খুঁজে পাওয়া, নিজের বিকাশকে তরান্বিত করা এবং অতীতের কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সক্ষমতা সবসময় আমাদের নিজেদের ওপরেই নির্ভর করে; আঘাতকারীদের ওপর নয়।

৭. ক্ষমা একটি প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে কিছু নয়: ক্ষমা করা মানে কোনো এক মুহূর্তে হঠাৎ সব ঠিক হয়ে যাবে, এমন ভাবা নয়। এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা বারবার নিতে হয়— কখনো প্রতিদিনও। কিছুদিন হালকা লাগবে, আবার কিছুদিন ক্ষোভ ফিরে আসবে। এটি খুবই স্বাভাবিক।

আমি লরেন্সের কাছে ঋণী— ও বলছিল, ‘নিজেকে দোষারোপ না করে বরং ধীরে ধীরে মুক্তিকে বেছে নাও; তিক্ততাকে নয়।’

ভুলতে না পারা বিষয়গুলো ক্ষমা করা মানে মানসিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপন করা। পরিস্থিতি বদলানোর অপেক্ষা না করে নিজেকে মুক্ত করার পথ তৈরি করার শিক্ষাদানের জন্য লরেন্সের কাছে আমার চির কৃতজ্ঞতা— ‘আঘাতকারীদের পরিবর্তন তোমার হাতে নয়; কিন্তু তোমার পরিবর্তন তোমার হাতে। ক্ষমা তাদের জন্য নয়— এটি তোমার নিজের জন্য। ক্ষোভ নিচের দিকে টানে— ক্ষমা উন্মোচন করে দেয় মুক্তির বিশাল আকাশ।’

[সঙ্গত কারণেই ফেইসবুকে পোস্ট আকারে লেখা বাদ দিতে চাইছি। বিশ্বাস করি, কিছু মানুষেরা লেখাগুলো পড়েন। সুতরাং লিংক শেয়ার করার অনুরোধ থাকবে।]

Find me here: morolsumon@gmail.com / +880 1911 265040 

কেন প্রেম হয় মধুর মতন আর ভাঙে হেমলকের ন্যায়?

 অটো থেকে নামলাম। বুঝতে পারছিলাম দেরি করে ফেলেছি। দৌলতপুর থেকে সোনাডাঙা পৌঁছতে দেরি করে ফেললাম অথচ মেয়েটা বাগেরহাট থেকে প্রায় ৫০ কিলো জার্নি করে আমার আগেই এসে পৌঁছেছে। ইতস্তত বোধ হচ্ছিল। ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। অটো ভাড়া পরিশোধ করে তাকালাম রাস্তার অপর পাশে। সোনাডাঙা বাস টার্মিনাল ঘেঁষা বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশটায় দাঁড়ানো দেখলাম। সবুজ কলাপাতা রঙের শাড়ি, খোলা চুল, কালো টিপ রাস্তার এপাশ থেকে দাঁড়িয়ে যেন পরীকে দেখছি। কী সুন্দর দেখতে! সামনাসামনি প্রথমবার দেখলাম। আমি পৌঁছে গেছি, সেটা না বলে যদি আরও কিছুক্ষণ দেখে নেওয়া যায়...পৌঁছনোর কথাটি তখনও বলিনি। তবু মুহূর্তেই আমাকে দেখে ফেলল। রাস্তা পেরোলাম। মুখোমুখি দাঁড়ালাম গিয়ে। এত মুগ্ধ যে, কথাই বলতে পারলাম না শুরুতে! কেবল চেয়ে থাকলাম চোখের দিকে। ‘দেরি করেছো! তবে বেশিক্ষণ নয়।’ আমাকে সহজ করে দিতেই বোধহয় বলল কথাটি। কেবল বললাম, ছবির চেয়ে সুন্দর মেয়েটিকে সামনে থেকে দেখছি! ‘বাড়িয়ে বলছ!’


রাস্তা পার হলাম। হাতটা ধরে ফেললাম সাবধানে রাস্তা পার করে দেবার অজুহাতে। অটো ধরলাম। সোনাডাঙা থেকে আমাদের গন্তব্য শিববাড়ি। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা গন্তব্যে অটো নিলাম। পাশাপাশি দুজনে। ৩ মাসের প্রেম দূরত্বের; মুখোমুখি কত কথা বলব বলে ভেবে রাখা সব কথা কোথায় যেন হাওয়ায় মিলিয়েছে। কেবল দেখছি। যেন বিশ্বাস হতে চায় না আমরা পাশাপাশি। কী কথায় যেন আমি লজ্জা পেলে হাসল। হাসলে ওর দাঁতগুলো যেন মুক্তো ছড়ায়। লজ্জা পেলেও ওর হাসি দেখতে থাকলাম। স্বপ্নের মতো অটো ট্রিপ সেরে আমারা নামলাম গন্তব্যে। প্রথম গন্তব্যের স্মৃতিরা নাহয় থাকুক ব্যক্তিগত। কেবল মনে পড়ে ওকে ছুঁয়ে দেবার প্রথম শিহরণ। কেবল মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ নাজিল হলো আমার ওপর।

বিকেল গড়ালে আমরা গেলাম রূপসা ঘাটে। নদীর পাড় ঘেঁষে বালু ফেলে রাখা, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা ইট, টং দোকান চায়ের, ছাউনির মতো দুয়েকটা ফুচকার দোকান। ‘আমাকে ফুচকা খাওয়াবে?’ ওর সারল্য শাড়িটার মতোই মনে হলো। সবুজ ও কোমল। প্লেটভর্তি ফুচকা খেলাম দুজনে। মনে পড়ে না, ওই বোধহয় জীবনে প্রথম ফুচকা খাওয়া আমার। তারপর থেকে ফুচকারে মনে হতো প্রেমের খাবার। মানুষ প্রেমে পড়লে ওটা খায় সঙ্গীরে নিয়ে।

টং দোকান থেকে চা নিলাম। সব অমিলের মধ্যে কেবল মিল দুজনেরই দুধ চা পছন্দ আমাদের। বিকেল আর রূপসা নদীকে সাক্ষী করে আমাদের প্রথম দ্যাখা লেখা হলো জীবনের খাতায়। সবকিছু স্বপ্ন আর সুখের মতো হতে লাগল। ততক্ষণে বিকেলের আলো মৃদু হয়ে এসেছে। ‘বাসায় দেরি হবে না?’ আমি বললাম। ‘হোক। থাকি না আরও কিছুক্ষণ।’ ‘থাকার সময়টুকু নাহয় এগিয়ে দিয়ে আসি?’ নিষ্পাপ মুখের সে হাসিটুকু চোখ বুজলে এখনও দেখতে পাই। রূপসা ঘাট থেকে রিকশা নিলাম আমরা। গন্তব্য সোনাডাঙা বাস টার্মিনাল।

সোনাডাঙা পৌঁছতে মাগরেব পড়ে গেছে। বাগেরহাটের বাসের টিকিট নিলাম দুটো। বাস ছাড়ার আগেই যেয়ে বেছে নিলাম পছন্দসই সিট। আস্তে আস্তে বাস ভরল। চলতে শুরু করল। জিরো পয়েন্ট ছেড়ে চলতে শুরু করল নিজের গতিতে। ‘একটা গান শোনাই?’ বলে হেডফোনের একটা স্পিকার ওর কানে গুঁজে দিলাম। সারা পথ অসংখ্য প্রিয় গান ওকে শোনালাম। দুটো স্পিকার দুজনের কানে; আমার কাঁধে ওর মাথা। কখন পথ ফুরিয়ে গেল না চাইতেও। বাস থামল বাগেরহাট টার্মিনালে। আমরা নামলাম। ‘আরও এগিয়ে দিই?’ আমি বললাম। ‘না,’ ও বলল, ‘এটা আমার এলাকা। কোনো দরকার নেই।’ রিকশা ডেকে দিতে চাইলাম। না করল। ‘রাস্তা পার হয়ে আমি ডেকে নেব। এটা রাখো।’ একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিল হাতে। ‘আমি যাবার পর খুলবে। বিদায় দাও। আসি।’

আফরিনকে বিদায় দিলাম। ওকে কিছুই দিইনি ভেবে কেমন অস্বস্তি হলো। ব্যাগটা খুললাম। এক অন্য উত্তেজনা। দুটো বই, ফুলের বাক্স, একটা মোড়ক, ছোট কাপড়ের আরেকটি ব্যাগ। মোড়কে গোল্ডলিফের প্যাকেট। ফুলের বাক্সে চিঠি ‘দিনে ৫টার বেশি নয়; সবচেয়ে খুশি হবো বাদ দিলে, যদিও একবারে ছাড়তে বলছি না। এবং আরও প্রেম...’ কাপড়ের ব্যাগটায় সানগ্লাস ব্রাউন কালারের। মেয়েটি পুরোদস্তুর আমাকে মুখস্থ করে নিয়েছে মনে হলো। কলাপাতার সবুজ শাড়ি, গোল্ডলিফের প্যাকেট, ব্রাউন কালারের সানগ্লাস, আর সবশেষে কবিতার বই জীবনান্দের! আহা!

সবটুকু চিনে নিয়েছে আমাকে। এত অবাক হলাম বোঝানো যাবে না! গোল্ডলিফ সিগারেট খাই, এটা কি কোনাদিন জিজ্ঞেস করেছিল! মনে পড়ে না। দরকারও নেই। খুশি নিয়ে বাসে চড়লাম আবার...আজ সেসব শুধুই স্মৃতি।

আফরিন! হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন, মাই লাভ! বলতে পারো, কেন প্রেম হয় মধুর মতন আর ভাঙে হেমলকের ন্যায়?

কেন প্রেম হয় মধুর মতন আর ভাঙে হেমলকের ন্যায়?

অটো থেকে নামলাম। বুঝতে পারছিলাম দেরি করে ফেলেছি। দৌলতপুর থেকে সোনাডাঙা পৌঁছতে দেরি করে ফেললাম অথচ মেয়েটা বাগেরহাট থেকে প্রায় ৫০ কিলো জার্নি করে আমার আগেই এসে পৌঁছেছে। ইতস্তত বোধ হচ্ছিল। ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। অটো ভাড়া পরিশোধ করে তাকালাম রাস্তার অপর পাশে। সোনাডাঙা বাস টার্মিনাল ঘেঁষা বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশটায় দাঁড়ানো দেখলাম। সবুজ কলাপাতা রঙের শাড়ি, খোলা চুল, কালো টিপ রাস্তার এপাশ থেকে দাঁড়িয়ে যেন পরীকে দেখছি। কী সুন্দর দেখতে! সামনাসামনি প্রথমবার দেখলাম। আমি পৌঁছে গেছি, সেটা না বলে যদি আরও কিছুক্ষণ দেখে নেওয়া যায়...পৌঁছনোর কথাটি তখনও বলিনি। তবু মুহূর্তেই আমাকে দেখে ফেলল। রাস্তা পেরোলাম। মুখোমুখি দাঁড়ালাম গিয়ে। এত মুগ্ধ যে, কথাই বলতে পারলাম না শুরুতে! কেবল চেয়ে থাকলাম চোখের দিকে। ‘দেরি করেছো! তবে বেশিক্ষণ নয়।’ আমাকে সহজ করে দিতেই বোধহয় বলল কথাটি। কেবল বললাম, ছবির চেয়ে সুন্দর মেয়েটিকে সামনে থেকে দেখছি! ‘বাড়িয়ে বলছ!’


রাস্তা পার হলাম। হাতটা ধরে ফেললাম সাবধানে রাস্তা পার করে দেবার অজুহাতে। অটো ধরলাম। সোনাডাঙা থেকে আমাদের গন্তব্য শিববাড়ি। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা গন্তব্যে অটো নিলাম। পাশাপাশি দুজনে। ৩ মাসের প্রেম দূরত্বের; মুখোমুখি কত কথা বলব বলে ভেবে রাখা সব কথা কোথায় যেন হাওয়ায় মিলিয়েছে। কেবল দেখছি। যেন বিশ্বাস হতে চায় না আমরা পাশাপাশি। কী কথায় যেন আমি লজ্জা পেলে হাসল। হাসলে ওর দাঁতগুলো যেন মুক্তো ছড়ায়। লজ্জা পেলেও ওর হাসি দেখতে থাকলাম। স্বপ্নের মতো অটো ট্রিপ সেরে আমারা নামলাম গন্তব্যে। প্রথম গন্তব্যের স্মৃতিরা নাহয় থাকুক ব্যক্তিগত। কেবল মনে পড়ে ওকে ছুঁয়ে দেবার প্রথম শিহরণ। কেবল মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ নাজিল হলো আমার ওপর।

বিকেল গড়ালে আমরা গেলাম রূপসা ঘাটে। নদীর পাড় ঘেঁষে বালু ফেলে রাখা, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা ইট, টং দোকান চায়ের, ছাউনির মতো দুয়েকটা ফুচকার দোকান। ‘আমাকে ফুচকা খাওয়াবে?’ ওর সারল্য শাড়িটার মতোই মনে হলো। সবুজ ও কোমল। প্লেটভর্তি ফুচকা খেলাম দুজনে। মনে পড়ে না, ওই বোধহয় জীবনে প্রথম ফুচকা খাওয়া আমার। তারপর থেকে ফুচকারে মনে হতো প্রেমের খাবার। মানুষ প্রেমে পড়লে ওটা খায় সঙ্গীরে নিয়ে।

টং দোকান থেকে চা নিলাম। সব অমিলের মধ্যে কেবল মিল দুজনেরই দুধ চা পছন্দ আমাদের। বিকেল আর রূপসা নদীকে সাক্ষী করে আমাদের প্রথম দ্যাখা লেখা হলো জীবনের খাতায়। সবকিছু স্বপ্ন আর সুখের মতো হতে লাগল। ততক্ষণে বিকেলের আলো মৃদু হয়ে এসেছে। ‘বাসায় দেরি হবে না?’ আমি বললাম। ‘হোক। থাকি না আরও কিছুক্ষণ।’ ‘থাকার সময়টুকু নাহয় এগিয়ে দিয়ে আসি?’ নিষ্পাপ মুখের সে হাসিটুকু চোখ বুজলে এখনও দেখতে পাই। রূপসা ঘাট থেকে রিকশা নিলাম আমরা। গন্তব্য সোনাডাঙা বাস টার্মিনাল।

সোনাডাঙা পৌঁছতে মাগরেব পড়ে গেছে। বাগেরহাটের বাসের টিকিট নিলাম দুটো। বাস ছাড়ার আগেই যেয়ে বেছে নিলাম পছন্দসই সিট। আস্তে আস্তে বাস ভরল। চলতে শুরু করল। জিরো পয়েন্ট ছেড়ে চলতে শুরু করল নিজের গতিতে। ‘একটা গান শোনাই?’ বলে হেডফোনের একটা স্পিকার ওর কানে গুঁজে দিলাম। সারা পথ অসংখ্য প্রিয় গান ওকে শোনালাম। দুটো স্পিকার দুজনের কানে; আমার কাঁধে ওর মাথা। কখন পথ ফুরিয়ে গেল না চাইতেও। বাস থামল বাগেরহাট টার্মিনালে। আমরা নামলাম। ‘আরও এগিয়ে দিই?’ আমি বললাম। ‘না,’ ও বলল, ‘এটা আমার এলাকা। কোনো দরকার নেই।’ রিকশা ডেকে দিতে চাইলাম। না করল। ‘রাস্তা পার হয়ে আমি ডেকে নেব। এটা রাখো।’ একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিল হাতে। ‘আমি যাবার পর খুলবে। বিদায় দাও। আসি।’

আফরিনকে বিদায় দিলাম। ওকে কিছুই দিইনি ভেবে কেমন অস্বস্তি হলো। ব্যাগটা খুললাম। এক অন্য উত্তেজনা। দুটো বই, ফুলের বাক্স, একটা মোড়ক, ছোট কাপড়ের আরেকটি ব্যাগ। মোড়কে গোল্ডলিফের প্যাকেট। ফুলের বাক্সে চিঠি ‘দিনে ৫টার বেশি নয়; সবচেয়ে খুশি হবো বাদ দিলে, যদিও একবারে ছাড়তে বলছি না। এবং আরও প্রেম...’ কাপড়ের ব্যাগটায় সানগ্লাস ব্রাউন কালারের। মেয়েটি পুরোদস্তুর আমাকে মুখস্থ করে নিয়েছে মনে হলো। কলাপাতার সবুজ শাড়ি, গোল্ডলিফের প্যাকেট, ব্রাউন কালারের সানগ্লাস, আর সবশেষে কবিতার বই জীবনান্দের! আহা!

সবটুকু চিনে নিয়েছে আমাকে। এত অবাক হলাম বোঝানো যাবে না! গোল্ডলিফ সিগারেট খাই, এটা কি কোনাদিন জিজ্ঞেস করেছিল! মনে পড়ে না। দরকারও নেই। খুশি নিয়ে বাসে চড়লাম আবার...আজ সেসব শুধুই স্মৃতি।

আফরিন! হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন, মাই লাভ! বলতে পারো, কেন প্রেম হয় মধুর মতন আর ভাঙে হেমলকের ন্যায়?

ভালোবাসা চিরস্থায়ী নয়— হৃদয় তো নয়ই

হৃদয় নিয়ে যে বসেছে ফুটপাতে

আসলে বোকা লোকটি—

জানে না

ভালোবাসা চিরস্থায়ী নয়

হৃদয় তো নয়ই

মূল্য তার ওঠানামা করে 

মফস্বলের সরল মেয়েটিরে পাওয়া যেতে পারে

কুড়ি টাকায়— কালো টিপ

ঢাকার নারীটি— মধ্যবয়সী 

দাম তার বেশি ঢের

মায়ের ওষুধের টাকা দিতে না পারা যুবকের নিকটে

যে চেয়ে ফেলে অগাধ— 

‘ফ্লাটের ভাড়া, ডায়েটের ফুড, ভিটামিন-জাতীয় মেডিসিন, মোটা চিকেন, আড়াই কেজি রুই’— এগুলো দেওয়া বলে না

আরও চাই ভ্রমণের টিকিট 

ব্যাংকের লোন ডিলে হয়

তবু ছোট বোন স্ত্রীর— বলে ফেলে অকাতরে ‘ছোটলোক’, মুরোদ নেই


শুনেছি, গোপনে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল

প্রেমিকা স্ত্রী-রূপে

পা ফাঁক করে দিলে যারা মনে করে

ভালোবাসা হয়

কে ড্রামা, পাকিস্তানি সিরিয়াল রোজ রাতে 

স্বামীকে অবলীলায় বলতে পারে,

মুখহাত ধুয়ে খেয়ে নাও— কিচেনের বাসন রাখবে ধুয়ে, কেটে রেখো আলু-পটল সকালের

যেতে পারো ঘুমিয়ে 

এলার্ম-ঘড়ির ডাকে উঠে পড়বে, ভাত বসিয়ে ডাকবে আমায় যদি চাও

চিত হয়ে পা ফাঁক করলে শোধ হয় পুরুষের ঘামের দাম

প্রেমের দেনা

এসব কাহিনি লম্বা বেশ—


বোকা লোকটি জানে না

ভালোবাসা চিরস্থায়ী নয়

হৃদয় তো নয়ই

একদিন যুবকেরে দিতে হবে সততার দাম

শহরে, নারীরা— পা ফাঁক করে চুকোতে পারে ভালোবাসার দাম

কে বড় শুয়োরের বাচ্চা?

যুবকটি?

স্ত্রী-রূপে নারীটি?

পুঁজি?

কী হবে জেনে?

মাকে পাঠাতে হবে ওষুধের দাম

তবু—


হৃদয় নিয়ে যে বসেছে ফুটপাতে

আসলে বোকা লোকটি—

জানে না

ভালোবাসা চিরস্থায়ী নয়

হৃদয় তো নয়ই

মূল্য তার ওঠানামা করে

লিভ ইন দ্য মোমেন্ট


খেয়াল করে দেখবেন, আমরা হয় অতীত; নয় ভবিষ্যতে বাঁচি। সকালে অফিসে যাই কিন্তু রিকশায় বসে ভাবি গতকালের ফেলে রাখা কাজের কথা কিংবা ভাবি, অফিসে শেষের শিডিউলের কথা। মুহূর্ত পেরিয়ে যাচ্ছি, হয়তো সবচে চমৎকার মুহূর্তটিই কিন্তু সেটা টের পাই পেরিয়ে আসার পর। কেন এমন হয়? সাইকোলজিকাল নানা কারণ তো রয়েছেই। কিন্তু এটি শতভাগ সত্য যে, অতীত বা ভবিষ্যৎ এড়িয়ে যদি কেবলমাত্র বর্তমানেই আমরা থাকতে পারতাম তাহলে জীবন সবচেয়ে সুন্দর হতো। সেটি কি সম্ভব? হ্যাঁ। সম্ভব। আমি দীর্ঘদিন ধরে সেটি নিয়ে কাজ করছি। একটি কোর্স ডেভেলপ করেছি। শিগগিরই সেটা উন্মুক্ত করব। যারা দরকারি মনে করছেন তারা কানেক্টেড থাকতে পারেন! লিংকের কমেন্টে ইমেইল এড্রেস দিয়ে রাখুন। 

শেয়ার করব, বর্তমানে বাাঁচার উপায়! হ্যাপি লাইফ টু অল।

তখন সকাল আড়ে আটটা

আমাদের একটা ঘর হবার কথা ছিল। দক্ষিণমুখী পাখি ডাকা জানালায় দুই কামরার ঘর। ভাড়া বাসায় দেয়ালের রং তোমার পছন্দ নয়— প্রায়ই বলবে, ‘কবে যে বড় নতুন বাসায় থাকতে পারব!’ আলমারি কেনার টাকা জমাতে জমাতে খরচ হবে অন্যখাতে। বুক শেলফটাকে আমরা বানিয়ে নেব অস্থায়ী কেবিনেট আমাদের কাপড় রাখার। আলাদা আলাদা তাকে আমি এমনভাবে সেগুলো সাজিয়ে রাখব, দরকারি জামাটা খুঁজে পেতে এলেমেলো করতে হবে সব জামাকাপড়। রাগে সব ছুড়ে ফেলবে বিছানায়। আমি গুছিয়ে নেব। 





রাত করে ফেরা আমার অভ্যেসে তুমি কখনোই মানিয়ে নেবে না। রাগ করবে। নটা বাজলে ফোন। সাড়ে নটা বাজলে ফোন। ১০টা বাজলে খুদে বার্তা দেবে, আজ দরজা খুলব না। যেখানে ঠেঙাতে গেছ সেখানে থাকো। তবু লিখে পাঠাবে, কাঁচা মরিচ নাই। কলা আনবে। মিশির জন্য অ্যালকুলি নিছিলে? মেয়েটা খেতে পারেনি দুপুরে। আমি খালি লিখব, ‘হ্যাঁ, ওকে।’ তুমি পালটা রাগের ইমোজি দেবে। পৌনে নটায় আমাকে ফোনে না পাওয়া সোয়া দশটায় দেখবে দরজায় কড়া নাড়ছি। দরজা খুলে হাঁটা ধরবে। আমি মরিচের ঠোঙাটা এগিয়ে দেব। না দেখার ভান করবে। খুঁজবে না বলা কিছু এনেছি কি না। হাত বাড়িয়ে হাতে গুঁজে দেব আচার বরই-তেঁতুলের। মুহূর্তে মুখটা আহ্লাদী হয়ে উঠবে আমার বউটার। খুচরো সদাই-পাতি নামিয়ে নেবে নিজের ঘরের। বলবে, সালাম দিয়ে ঢুকবা। ঘরে ঢুকে আলিঙ্গনে নেব তোমাকে। বলবে বিরক্ত হয়ে, সারা গায়ে সিগারেটের বাজে গন্ধ! উফ! বিড়িখোর কেন যে আমার কপালে জুটেছিল! আমি ভয়ে ভয়ে ঢুকব ওয়াশরুমে। মুখ-হাত ধোব, ব্রাশ করে নেব। ফ্রেশ হয়ে খেতে চাইব। তুমি বলবে, আগে নামাজ তারপর ডিনার।  আমি নামাজে দাঁড়াতে বলবে, ফটকা নামাজ যেন না দেখি। শেষ করো। মিশিকে দেখে আসি। নামাজ শেষ করে আমি ফোন হাতে নেব। ফিরে এসে বকবে আমাকে। সারাদিনই তো ফোন নিয়ে থাকো। বাসায় না করছি না? ফোন রেখে তোমাকে ধরব। কোলে করে নিয়ে যাব কিচেন অব্দি। খাবার গরম দেব একহাতে। অন্যহাতে তোমার হাত।


একদিন বিষ্যুদবার। দেরি করে ফিরব আগেই বলে রাখা বউটা আমার রাত্রি সাড়ে ১০টায় টেক্সট করবে, দুনিয়ায় কাদের এত রাত অব্দি কাজ থাকে আমি জানি না। কাজের নামে ঢোঢো। আড্ডা মেরে ফিরবে। গাঁজা-ফাজা টানবে। আর আমাকে বলবে, কাজ। মিথ্যুক! একটাদিনও শয়তানের বাচ্চার জন্য টাইমলি ঘুমোতে পারি না। আমি লিখব, ‘সোনা আজ বিষ্যুদবার।’ ‘বিষ্যুদবার তোকে বোঝাব, বাসায় আয়।’ তুমি লিখবে। পৌনে ১১টায় আমি পৌঁছব ঘরে। দরজায় নক করার পর খেয়াল হবে দরজা তো খুলেই রেখেছে আমার পাখিটা। ঘরে ঢুকে টিফিন বাটি রাখতেই কানে আসবে— ‘১৫ মিনিটের মধ্যে সব শেষ করে লাইট অফ করে শুতে আসবা। না জড়িয়ে ধরলে আমার ঘুম আসে না।’ আমি আচ্ছা বলে চটজলদি সব শেষ করে বারান্দায় যাব। তুমি বলবে, ‘যা তুই আজকে! তারপর দেখ কী করি!’ বারণ শুনেও যাব আমি। ফিরব ২ মিনিটে। ব্রাশ সেরে বিছানায় পড়ব ধপাস করে। তোমার পায়ের ওপর পা। পা নেবে সরিয়ে। ধরব জড়িয়ে। হাত সরিয়ে দেবে। খুনসুটি রাগ অভিমানে আমি হাত ছুঁয়ে দেব অভিসারের গভীরে। রাগ করে বলে উঠবে, অসভ্য। আমি বলব হ্যাঁ। তুমি বলবে ধরে থাকো। আমি হেসে উঠব হে হে। বলবে ওটা নয়, আমাকে ধরে থাকো। থাকো জড়িয়ে। নড়বে না। আমি ঘুমোব। তোমার চুলে নাক ঘষে শুয়ে থাকব। ১০-১৫ মিনিটে শুনব তোমার গভীর নিশ্বাস। আস্তে ধীরে তোমাকে ছেড়ে দিয়ে স্ক্রিনের লো লাইটে বিজনেস নোটিফিকেশনগুলো আরেকবার দেখে নেব। পৃথিবীর অন্তর্জালে লিখে আসব— ‘বিষ্যুদবার রাত হওয়া চাই দীর্ঘ।’ সাইলেন্ট মোডে দিয়ে ফোন যাব ঘুমিয়ে তোমার ঘুমের সুরে। নড়ে উঠবে খাটটা। ঘুমের মধ্যেও দেখাবে মেজাজ। উলটো দিকে আমি পাশ ফিরব। আমাকে জড়িয়ে যাবে ঘুমিয়ে। ভালোবাসা বুকে নিয়ে শুয়ে থাকব যৌথ বালিশে আমরা দুজনে। বিষ্যুদবারের নিয়মিত রাতে সংসার না হওয়া আমার ভাই ব্রাদাররা পড়বে সে লেখাটি— ওহ দাদা তারা বলবে। অথচ দীর্ঘ রাতের আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে নিয়মিত রাতের আয়োজনে আমি ঘুমিয়ে যাব প্রিয়তমা স্ত্রীকে বুকে নিয়ে। তোমার সাথে সেই ঘর দু কামরার— আর সকাল শুক্রবারের। 


বেলা করে উঠব যখন তখন সকাল সাড়ে আটটা। 

এক মানবজনম প্রায়শ্চিত্তের

পাপ কাঁধে পুণ্যের আকাঙ্ক্ষায় করে যাচ্ছি প্রায়শ্চিত্ত— 

যা বলা হয়ে গেছে

যা হয়ে গেছে ঘটানো

যা গেছে রটে

অতঃপর কোর্টে



ফিরে এসে কেবলই মনে হয়— কেন এই জন্ম

কেন পা রাখা ঘরে অপরের

কেন সব ভুল বিকশিত গন্ধম ফুল 

কেন গিলেছিল ইভ

কেন বিতাড়িত ঈশ্বরের ঘর থেকে

কেন এই মানবজনম প্রায়শ্চিত্তের

তবু বোধ এক মানুষের— কী হয় কী হয়

দুই যুগ আগের কথা। ক্লাস টু-তে পড়ি তখন। একদিন মার্বেল খেলায় মাসুদকে শায়েস্তা করার জন্য খেলায় না পেরে ওর ঘড়িটা পকেটে পুরে নিলাম। প্রতিদিন আমার ও অন্যদের সব মার্বেল জিতে নেয়া মাসুদ— চাচাতো ভাই ও বন্ধু। গতরে শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান ওর সাথে না পারি মার্বেল খেলায়, না পারি ডাংগুলিতে, না পারি ফুটবলে। সেদিন কী মনে হলো, খেলায় নে মার্বেল জিতে— খেলা শেষে টের পাবি প্রিয় ঘড়ি হারানোর মজা। টানটান উত্তেজনায় সবার খেয়াল ৪২ গুটির মার্বেল ময়দানে। হাতে লম্বা মাসুদই জিতবে দান। তারপর বলবে, ‘আজ আর খেলব না।’ মজা দেখবি তখন। ঘড়ি না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যাবি আজ। অনুমানই হলো সত্যি। ৩ বারের ঘুরে যাওয়া দান জিতে লাফিয়ে উঠল মাসুদ। থলের মধ্যে সব মার্বেল ভরে বলে উঠল, ‘আজ আর নয়। মা মারবে দেখলে। চললাম।’ মাসুদকে কেউ কেউ থামানোর চেষ্টা চালাতে আমি ঘড়িটা লুকিয়ে ফেললাম কায়দা করে। হট্টগোল হলো। খেলা হলো বন্ধ। চলল যে যার মতন। মার্বেল খোয়া গেলেও বিজয়ী মাসুদের আগমনী মন খারাপে ভেতরে তাই শয়তানি আনন্দ। পথ এগোনোর ভান করেও তাই না এগিয়ে চলেছি। মাসুদ উঠল লাফিয়ে। ‘আমার ঘড়ি।’ ‘কী হলো, ভাই? আমি মুখ ফিরালাম। ‘মার্বেল খোয়া গেল তোরও?’ ‘ঘড়িটা পাচ্ছি না।’ মুহূর্তেই কেঁদে ফেলল মাসুদ। ‘এখানেই রেখেছিলাম।’ গতরে স্বাস্থ্যবান ছেলেটির ওভাবে মুহূর্তে মুষড়ে যাওয়া মনের ভিতরে বইয়ে দিল আনন্দ। আগেভাগেই ঘড়ি খোঁজার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলাম। ‘এই দাঁড়াও সবাই।’ আমি হাঁক দিলাম। ‘যারা চোখের আড়াল হয়েছে ডাক সবাইকে।’ 



মার্বেল খোয়ানো পাড়ার ছেলেরা ৫ কি ৬ জন, মাসুদ ও আমি। ‘মাসুদের ঘড়ি পাওয়া যাচ্ছে না।’ সবার উদ্দেশে বললাম। ‘সবার পকেট দেখা হবে,’ বলে মাসুদকেই নির্দেশ দিলাম ঘড়ি খুঁজে বের করার। একে একে সবার পকেট হাতড়ানো হলো। ঘড়িটা নেই। ‘মাসুদ কেন বাদ যাবে?’ আমি বললাম। আরেকজনকে নির্দেশ দিলাম মাসুদের পকেট চেক করার। মাসুদের পকেটেও নেই। মাসুদের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। প্রিয় ঘড়ি হারানোর শোকে কাঁদছে ছেলেটা। এত বেশি দুঃখ দেব ভাবিনি আগে। তার ওপর আমার ভাই। খারাপ লাগার সাথে লাগছে আনন্দ পৈশাচিক। রোজ রোজ খেলায় হেরে আমাদের মন কেমন করে আজ টের পাবে মাসুদ। দুজনকে নির্দেশ দিলাম এদিক-সেদিক খুঁজে দেখার। কোথাও পাবে না জানি। মাসুদের কান্না, দলের ছেলেদের বোকা হওয়ার সাথে আমার মনের পৈশাচিক আনন্দ। 


আনন্দ দীর্ঘ হলো না খুব। কে জানি খবর দিয়েছে মাসুদের মাকে। মরিয়ম চাচী। চাচি আসল লাঠি হাতে। মাসুদকে পেটাবে ভেবে আনন্দ আর বেদনা হলো সমান তালে। চাচি এসে শুনল, ঘড়ি খোয়া গেছে মাসুদের। কিচ্ছু বলল না। একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করে চেক করা হলো আবার। দেখা হলো এদিক-সেদিক। কোথাও নেই মাসুদের প্রিয় ঘড়ি। মাসুদের মা সবাইকে বলল, ‘তোরা কেউ পেলে বাড়িতে দিয়ে যাস। পায়েশ-মাংস রেঁধে খাওয়াব তাকে।’ 


ঘড়ি খোঁজা সাঙ্গ হলে সবাই চলল যে যার মতন। আমি তবু অপেক্ষা করে যাচ্ছি, ছেলেটার মন খারাপ দেখব বলে। চাচি মাসুদকে বলল, ‘তোকে আবার কিনে দেব ঘড়ি। বাড়ি চল বাপ। তোর আর চিন্তা কী! চিন্তা হবে তার, ঘড়িটা যে লুকিয়েছে। হাতে পরতে পারবে না। দু'দিন বাদে ফেরত দেবে, দেখিস।’ 


মা-ছেলের কথোপকথন শুনলাম। ও বয়সে কি আর ওসব কথার মর্মার্থ যায় রে বোঝা! বাড়ি চলে এলাম। ঘণ্টা বাদে গেলাম ঘড়িটার কাছে। যেন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। হাতে পরে দেখলাম। ভালোই। বুঝলাম, সকলের সামনে পরা চলবে না। চিনে ফেলবে সবাই। ঘড়িটার হাসিমুখ আর মাসুদের খারাপ লাগা ভেবে আনন্দ হলো আবার। পৈশাচিক আনন্দ। ‘আহা রে মাসুদ! রোজ রোজ আমার হেরে কেমন লাগে টের পাচ্ছিস ভাই!’ মাসুদকে ব্যঙ্গ করলাম। পকেটে পুরে ঘড়িটা চলে এলাম বাড়ি। 


ঘরে ব্যাগের পকেটে রাখলাম। ঘড়িটার প্রতি লোভ নেই। লোভ মাসুদের দুঃখ দেখা। বিকেল হলো। আজান হলো। সন্ধ্যা হলো। মাসুদের দুঃখ পাবার স্মৃতি হলো ম্লান। বোধ হলো, ‘কাজটা ঠিক করিনি।’ কালই কৌশলে ঘড়িটা ফেরত দেবার ব্যবস্থা করা যাবে ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। যথারীতি পরদিন স্কুল ফিরে ফেরত দেবার চিন্তা রেখে গেলাম স্কুলে। বোকার মতন ভাবিনি, ওটা প্রতিদিন বেলা ১২টায় এলার্ম দেয়। স্কুল ফেরার পথে টের পেলাম ঘড়িটা মাসুদ বুঝে পেয়েছে। ১২টায় এলার্ম দিচ্ছিল। মা-বোন কেউ টের পেয়ে মাসুদকে ডেকে ফেরত দিয়েছে। মাসুদের সে কী আনন্দ ঘড়ি খুঁজে পেয়ে। বাড়ি ফেরার পথে মাসুদের ঘড়ি বুঝে পাওয়ার ঘটনায় আমার হলো ভয়। ‘আব্বাকে যদি বলে দেয় মাসুদ! কী হবে? মাইর মাটিতে পড়বে না একটাও।’ ভয়ে ভয়ে পা, ভয়ে ভয়ে পদক্ষেপ...

[বহুবছর পর আজ কেন জানি মনে পড়ল ঘটনাটা। মাসুদ, ভাই আমার গল্পটা মনে রেখেছে কি না জানি না। কিংবা অন্য কারো স্মৃতিতে আছে কি না জানা নেই।

৩১ বছরের জীবন-অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মানুষ বুঝে হোক, না বুঝে হোক কিছু ভুল করে ফেলে পরে করে দুশ্চিন্তা, যদি আব্বাকে বলে দেয়! কী হবে তখন! আমি শেষ! ইত্যাদি ইত্যাদি। বলি কী, যদি সুযোগ থাকে তো ঘড়িটা ফেরত দাও। খেলায় হেরে কারো প্রিয় ঘড়ি লুকিয়ে রেখে ক্ষণিকের আনন্দ হয়তো পাবা; একইসাথে আব্বার কানে যাওয়া নিয়ে ভয় তোমাকে পেতেই হবে যদি কাউকে দুঃখ দিতে খেলায় হেরে লুকায়ে রাখো কারো প্রিয় ঘড়ি। 


জীবন এমন রে সোনা, সব ফেরত দেয়। ভালোবাসা ফিরে আসে অন্যরূপে যা আমরা হারিয়ে ফেলি। ফিরে আসে প্রতারণাও। অপেক্ষা করো, আমার জীবনের বোন।]

চার কোটি মানুষের ভিড়‒ তবু মনে হয় খাঁখাঁ বিরানভূমি এ জনপদ

 আমরা তিন ভাইবোন। শিউলির পরে আমি, তারপর ছোট বোন শিল্পী। ছোটবেলায় শিউলি ছিল দাদির পাগল। এত পাগল যে, ওকে ছাড়া দাদি কোথাও যেতে পারত না। খেতে পারত না। পাড়া বেড়াতে পারত না। দাদিকে না পেলে শিউলির যে বিলাপ শুরু হতো তা দেখা যায় না। ছটফট করত। কী যে কান্না করত বলে বোঝানো যাবে না। একবার দাদি শিউলিকে রেখে বাপের বাড়ি বেড়াতে যায়। স্কুল ফেরত শিউলি এসে দাদিকে না দেখে সেই যে কান্না জুড়ল, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সন্ধ্যা-রাত অব্দি। সারা বিকেল ওকে কেউ থামাতে পারেনি।


আমাদের গোরস্তানের পথ ধরে মাঠের রাস্তা। তারপর বড় রাস্তায় মিশে দাদির বাপের বাড়ির পথ। শিউলি দাদির বিলাপে সারা বিকেল ওই পথে ছুটে ছুটে যায়; কেউ ধরে এনে শান্ত করে; কিছুক্ষণ পর আবার পথ ধরে দৌড় দেয়। ‘ও দাদি, ও দাদি…’ সারা বিকেল-সন্ধ্যা এভাবে চলেছে। বিকেলে ওকে কাঁদতে দেখে খেলতে গিয়েছি; মগরেবের সময় এসে শুনি সে আবার মাঠের রাস্তায় দৌড় দিয়েছে দাদির কাছে যাবে। ইদগাহ অব্দি যেয়ে দেখি সে প্রায় বুধোর বাড়ি বড় রাস্তার কাছাকাছি। ওর পাগলপ্রায় দৌড়ানি; দাদি, দাদি বলে চিল্লানো দেখে আমার হাসিই পেল। ওকে ব্যঙ্গ করে মনে মনে বললাম, ‘আমারও তো দাদি। আমি তো দাদিকে ছাড়া দিব্যি থাকতে পারি। বাড়িতে আব্বা আছে, মা আছে; আমরা ভাইবোনেরা আছি। তোর দাদিকে লাগবেই কেন!’ দাদিই ওর পুরো দুনিয়া। বোকা মেয়ে!

কেমন মায়া হলো ওর প্রতি! দাদির প্রতি রাগ হলো। কেন মেয়েটাকে সে না নিয়ে চলে গেল বাপের বাড়ি!

কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। সম্ভবত আরও বেশি। দাদি আজ নেই। শিউলির ছেলেটা ক্লাস এইটে। আজ যদি ওকে বলতে পারতাম, ‘বু’জান আমার! একটা মানুষ মানুষের হতে পারে পুরো দুনিয়া।’ বুজান, কার কাছে যেয়ে বলব, কোন পথে দৌড়ে করব এ বিলাপ!

‘বু’জান আমার! তোকে ব্যঙ্গ করার পাপেই কি আজ খোদা আমার দুনিয়াটা কেড়ে নিল! দাদির মতো একজনই কেবল নেই; চার কোটি মানুষের ভিড় তবু মনে হয় খাঁখাঁ বিরানভূমি এ জনপদ। ‘ও বু’জান! আমাকে একটাবার জড়িয়ে ধর আজ।’

 

তবু হৃদয় শান্ত আর ধীর

 জুতো কেনার জমানো টাকা দিয়ে মদ কিনে ঘরে ফিরলাম। কেরানি জীবনে নবাবি বলতে দর কষাকষি ছাড়াই রিকশায় চেপে বসা আজিমপুর যাবেন?

জানালার সুন্দর সাদা পর্দা, চকচকে দেয়ালের রং, বেতের সোফা এমনিতেই ছোট ঘর, এতকিছু ঢুকে পড়লে নিজের জায়গাটুকু থাকে না। পয়সা কোথায় সেসব কেনার? নেই। আসবাবহীন ঘরটাকে নিজের বলে মনে হলো। ইচ্ছে হলে সিগারেটের ছাই ফেলানো যায়, গেলাসে ঢালা যায় লাল জল, চিপসের প্যাকেট ছুড়ে ফেলা যায় মেঝেতে যেন ছুড়ে ফেলছি ছোটলোক বলে অবহেলা করা তোমারই সে পুরোনো চিঠি। জন্মদিনে আমাকে লেখা হয়েছিল ‘ভালো বন্ধু।’

দুই গেলাস শেষ হলো। মাথা এলোমেলো হয়ে আসছে। তবু হৃদয় শান্ত আর ধীর। সব টের পাচ্ছি মনে হলো এখনও তোমারে ভালোবাসি সব অপমানের পরেও। পিঠের দেয়াল থেকে বেরিয়ে এলো তোমারই ছোটবোন। আমারে সঙ্গ দিতে। বললাম, বেদুইন জীবনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিয়ম করে ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষাই তো প্রেম। এখনও জমে আছে হৃদয়ে। আমার কথাবার্তা পাত্তা পেলো না। ‘তুমি একটা বাজে লোক। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখো।’

আয়নায় নিজেরে দেখলাম পৃথিবীর সবচে সুন্দর চিত্রনাট্য প্লে করা হলো।

বৈশাখের খা খা ভোরে আমার জন্ম। আজান হচ্ছিলো সম্ভবত। সকালের রোদ তীব্র হওয়া অব্দি সবাই আমাকে ঘিরে ছিল। দমবন্ধ লাগছিল। বাবাকে দেখলাম না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। মায়ের জন্যে মন খারাপ হলো। ততক্ষণে হারিয়ে গেছে বাড়ির পথ। আমি বড় হয়ে গেছি মা টেরই পায়নি। রাস্তা খুঁজে হয়রান হলাম। ক্লান্তিও লাগছিল। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। খিদে পাচ্ছিল। সাদা ভাত, ডাল আর নরম বিছানার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাঁটছিলাম। কেবলই হাঁটছি।





ঠিকানা জানি না তবু থামলাম। নক করলাম। দরজা খোলা হলো। যেন অবগত আমি আসব। তবু বসতে বলা হলো না। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। কিচেনে রাখা আছে ভাত-ডাল? সেখানে গেলাম। এঁটো বাসন-কোসন পড়ে আছে। থালার অভাবে ভাত খেতে দেয়া যাচ্ছে না ভাবলাম। ক্লান্ত তবু ধুয়ে ফেললাম। বড় থালা। ফুলের ছবি চারপাশ জুড়ে। ভাত বলে মনে হতে লাগল। খিদেও পেয়েছে বেশ। কারও মনোযোগ পাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। মনে হলো খুব ভিড়ের ভিতর হারিয়ে ফেলেছি মায়ের হাত ‘আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও। খিদে পেয়েছে আমার। বাড়ি গিয়ে ভাত খাব।’

কেউ শুনলো না। স্ক্রিন চালু হলো। সুর শুরু হলো। সিনেমা শুরু হলো কাজলের দিনরাত্রি।

আমার ক্ষুধার হাহাকার ঢাকা পড়ে গেল। ট্যাপের জলের সাথে মিশে যদি হারিয়ে ফেলা যেত নিজেরে পাতালপুরির দেশে! জলের সাথে নিজেরে মিশিয়ে দিলাম।

সবুজ পুরোনো দেয়াল-ঘেরা ঘরে নিজেকে টের পেলাম। সকাল হয়ে গেছে। বাইরে ঘন কুয়াশা। ক্ষুধা আর কেরানির জীবন নিয়ে উঠে পড়লাম। একই কিচেন। একই জলের ট্যাপ। সেই ঘর যেখানে পৌঁছেছিলাম ঠিকানা না জেনেই। উঠে পড়তে হলো। যেন কেউ দেখে না ফেলে! জল গরম করে তড়িঘড়ি স্নান সারলাম। বিষাদের শরীরে গরম জল আহা। লাল জলের কথা মনে হলো। মনে হলো বেরিয়ে পড়তে হবে।

মদ গেলার ঘটনা মনে পড়ছে না। আসবাবহীন পুরোনো ঘরটা নেই। বোতলটা উধাও।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই সকাল মাঝের কিছুই মনে পড়ছে না। জুতো কেনার আকাঙ্ক্ষা, কেরানি জীবন, মদের বোতল কিছুই মনে পড়ছে না। কেবল টের পেলাম ক্ষুধা।

বেরিয়ে পড়লাম।

 

যাযাবর/২০ পৌষ, ১৪২৯

যীশুর পুনরুত্থান

 




একজন ক্রীশ্চন যেভাবে বিশ্বাস করে— যীশু ফিরে এসেছিল

বাবাও আসবে ফিরে বিশ্বাস করে আড়াই বছরের শিশু
বাবা তার পা হারিয়ে নিরুদ্দেশে
মা তার ঘুমের ঘোরে পুরনো প্রেমিক পোষে।
বহুগামী রাষ্ট্রে হারিয়ে গেলে ফিরে আসে না কিছুই জানে ওই বুড়ো
পুত্রের শোকে যার যায় দিন
স্ত্রীর ক্যান্সার সারবে না জেনেও যেভাবে
মিথ্যের বেসাতি বাড়িয়ে একদিন
বুড়োটা মরবে শিশুটির মায়ের ফুরোবে যৌবন
বাবা আর ফিরবে না ফিরবে না
বড় হয়ে জানবে সে
অথচ একদিন সবই ছিল
পৃথিবীতে ছিল রোববার যীশুর পুনরুত্থান
বড় হয়ে জানবে সে ভালোবাসা এক ভয়ংকর মিথ আর
একদিন পৃথিবীতে প্রেম ছিল।

আমি কি তবে বেঁচে আছি? তবে কি ওঁরা আমাকে মৃত ঘোষণা করলো?

আমি জানি না, আমার অনুপস্থিতিতে আমার সন্তানদের কী অনুভূতি হয়

আমার প্রিয়তমা স্ত্রী আমাকে নিয়ে কী চিন্তা করেন

মা কাঁদেন কিনা

বাবা দুঃখ করেন কিনা

বন্ধুরা কী সমালোচনা করেন

কমরেডগণ প্রেসের কাছে কী বিবৃতি দেন

সহকর্মীরা আমার ফিরে আসার প্রত্যাশা করেন কিনা


আমি জানি না, তাঁদের কে কী ভাবেন, কী চিন্তা করেন, কার কী দুঃখ বোধ হয়

কিন্তু আমি সবার বিষয়ে জানি আর জানি, আমার কোনো অস্তিত্ব নেই।


খুব ব্যস্ততার দিনে ধরুন, বুধবারের সকালে।

সন্তানেরা কাঁদছে। স্ত্রী বিলাপ করছে। মা কাঁদছেন অঝোরে। বাবা ঈশ্বরের প্রতি বিরক্তি জানালেন কেন তাঁর আয়ু নিয়ে আমাকে আরও, আরও কয়েকবছর জীবন দান করা গেল না।

বন্ধুদের কেউ ভক্ষণযোগ্য রোস্ট মুখে পুরে দিয়ে যেভাবে বিরোধী দলের সমালোচনা করা হয় সেভাবে কিছু পয়সা পাওয়া যেত। মৃতের ঋণ মওকুফ পুণ্যের কাজ বলে গোরখনন কমিটিকে তলব করলেন একজন। সহকর্মীদের কেউ এত তাড়াতাড়ি! বড্ড তাড়া আমার বলে দুঃখই করলেন বোঝা গেল।

শৈশবের প্রিয় বন্ধুর চোখে জল নেই। কীভাবে আরও সুন্দরভাবে কবরটি খোঁড়া যায় তদারক করছে। একজন ইমামকে আনতে গেছে। বরই পাতা, গোলাপ জল নিয়ে ব্যস্ত কেউ কেউ।

কয়েকজন কমরেড এসেছেন। মুখের পর্দা সরানো হলো আমার দিকে তাকালেন। দুজনের চোখের কোনায় জল। তিনজন প্রতিবেশীদের সাথে দাফন নিয়ে আলাপে আগ্রহী হলেন।

গোসল সম্পন্ন হয়েছে। জানাযার আগে ছোট চাচা জানালেন, পাওনা তাঁর কাছে চাইতে।

নিজের কাছে আমারও কিছু পাওনা ছিল।


[আমি ছিলাম ঘুমকাতুরে। তার জন্যে মা আমাকে বকতো খুব। বাবা বলতো, আমার কখনও উন্নতি হবে না। ঘুমের জন্যে ক্যারিয়ার, ঘুমের জন্যে সংসার, ঘুমের জন্যে স্ত্রীর সাথে বিরোধ, সন্তানের অভিমান আরও কত কী! এমনই এক বুধবারের সকাল নটায়; আমি ছিলাম ঘুমে কান্নার শোরগোল।]

রাতের ব্যাকপেইন কিছুটা আছে। তার মানে? আমি মরিনি?

আমি কি তবে বেঁচে আছি? তবে কি ওঁরা আমাকে মৃত ঘোষণা করলো?


দেহটাকে শুইয়ে রেখে আমি বাইরে এলাম। সিগারেট ধরালাম। সবকিছু কেমন স্বাভাবিক লাগছে। তবে কি আমি সত্যিই মরিনি? স্ত্রীর ঘরে গেলাম। অফিসে চলে গেছেন।

নিজের বসকে ফোন দিলাম। টাইম ম্যানেজমেন্ট যার নেই তার আর চাকরি নেই বলে তাঁর পিয়ন জানালো

তবে কি আমি জীবিত? নাকি মৃত? নাকি মরে গেছি বহুকাল আগে? নাকি আজ? বুধবারের সকালে। নাকি মরিনি? আমি কি তবে জীবিত?

ক্ষুধা লাগেনি। তবে কি বেঁচে আছি? আত্মাকে যে শুইয়ে রেখে এলাম নিজের ঘরে

নিজের ঘরটাকে খুঁজে পাচ্ছি না। তবে কি আমার নিজের কোনো কামরা ছিল না?

আকাশে ঘোর অন্ধকার। মেঘেদের শোক। তবে কি সত্যিই আমি আর বেঁচে নেই? আমার চোখের জল? তা-ও তো নেই। তবে কী? আমি জীবিত? নাকি মৃত? নাকি মরে গেছি বহুকাল আগে? নাকি অন্যকিছু? বৃষ্টি শুরু হলো। আকাশের নিচে দাঁড়ালাম। ঈশ্বর, আমি কি বেঁচে আছি? তবে আমার প্রার্থনা কবুল করো। আমাকে মিশিয়ে দাও বৃষ্টির ফোঁটায়। শেষ প্রার্থনাটুকু মঞ্জুর করো, প্রিয় ঈশ্বর।

কিংবা আমাকে জানাও, আমি জীবিত। আমি মরিনি। আমি বেঁচে আছি।


২রা ফেব্রুয়ারিঃ শিক্ষার সওদায় রাবি প্রশাসনের নগ্ন চেহারা

গুলিতে আহত শিক্ষার্থী


২রা ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের আজ ১১ বছর। হামলাকারী প্রশাসন ও তার সহযোগীদের করা ছয়টা মামলা এখনও চলমান। বিজ্ঞ আদালত ইতোমধ্যে দুটো মামলায় ছাত্রদের পক্ষে রায় দিয়েছে বলে জেনেছি। টিউশন ফি প্রত্যাহার আর পয়সার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্সের সনদ বিক্রির পাঁয়তারা রুখে দিতে ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলো সেদিন। পাঁচ সহস্রাধিক ছাত্রের সেই বিক্ষোভ থামাতে গুলি ছুড়েছিলো তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়েস তখন তেতাল্লিশ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাইভেটাইজড করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ছাত্ররা বিক্ষোভ করছিলো সেদিন। কিন্তু প্রশ্নটা যে সওদাগিরির! পয়সা কামানোর! পয়সার প্রশ্নে তাই ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আদেশ দিতে ভুল হয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। পুলিশ আর ছাত্রলীগকে দিয়ে ঘৃণ্য হামলা চালায় নিরীহ ছাত্রদের উপর। ব্যাপক হামলা, ছররা বুলেট, রাবার বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত হয় ছাত্রদের পিঠ। ১২ জন ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়, আহত হয় শতাধিক। [প্রকৃতপক্ষে, হতাহতের সংখ্যা কয়েকশো বলে ধারণা করা হয়]

হামলা থেকে নিজেদের বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার সওদাগর ততকালীন প্রশাসনের নগ্ন চেহারা উন্মোচিত হয়েছিলো সেদিন, ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তারিখে। দিবসটির আজ সাত বছর। বিগত ছয় বছর ধরে দিবসটিকে শিক্ষা রক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালইয়ের শিক্ষার্থীরা। ছাত্ররা সেই আন্দোলনে পরাজিত হলেও নৈতিক জয় ছিলো ছাত্রদেরই। প্রকৃত পরাজয় হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাবলম্বী করে তোলার বিদেশী পরামর্শ বাস্তবায়নে ক্লাসরুমগুলোকে ব্যবহারের দারুণ সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায়নি। ক্রমাগত অস্থিতীশীল চাকরির বাজারে, ক্রমবর্ধমান সনদের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে পয়সার বিনিময়ে সনদ বিক্রির লোভনীয় প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে তাই মরিয়া হয়ে ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে ২০১৪ সালে বেশকিছু বিভাগে ইভনিং মাস্টার্স চালু করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রশাসন। চাহিদার বিপরীতে অপ্রতুল অবকাঠামো, মানহীন এবং অপর্যাপ্ত শিক্ষকের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের করুণ দশায় যারা কখনও সেসবের সমাধানে উফঃ পর্যন্ত করেনি, তারা ক্লাসে ক্লাসে সান্ধ্যকোর্সের পক্ষে বয়ান হাজির করতে থাকে, সান্ধ্যকোর্সের অতিরিক্ত আয় দিয়ে বিভাগগুলোর উন্নয়ন হবে, শ্রেণিকক্ষের আধুনিকায়ন হবে ফলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। অথচ ধূর্ত শিক্ষকেরা তর্ক এড়িয়ে যান, ক্লাসের ডিজিটালাইজেশান মানেই শিক্ষার উন্নয়ন নয়। এক্সট্রা কোর্সের লেকচার প্রস্তুত, ক্লাসে সেগুলোর ডেলিভারিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের ফলে নিয়মিত কোর্সের কার্যক্রমে অমনোযোগী হয়ে পড়া, অপ্রতুল কাঠামোয় আরও শিক্ষার্থীর চাপ সমস্যাগুলোকে প্রকট করে তোলার হুমকি, সাধারণ ডিগ্রি পাশের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ডিগ্রি চাকরির বাজারে যোগ্যতার ভারসাম্য ব্যাহত করা এবং সনদ বিক্রির পয়সা পকেটস্থ করার লোভে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সওদার পদক্ষেপের বিশাল তর্ক সেসব পন্ডিত শিক্ষকেরা সুকৌশলে এড়িয়ে যান। ফলে সচেতন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিজেদের করণীয় ঠিক করতে দেরি হয়না। সবচে প্রান্তিক, ন্যূনতম আয়ের যেকারো উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্যেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি, পয়সার বিনিময়ে শিক্ষা নীতিতে তাদের বেশিরভাগের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিনষ্ট হবার সিদ্ধান্তকে তাই তারা প্রত্যাখ্যান করে আত্মমর্যাদার সাথে। নেমে আসে রাস্তায়। সান্ধ্যকোর্স বন্ধে প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দেয়, স্মারকলিপি দেয়। কিন্তু ব্যবসায় নীতির প্রশাসন পয়সার লোভকে উপেক্ষা করতে পারেনি ফলে ছাত্রদের সাথে তাদের মতবিরোধ স্পষ্ট হয়। বেনিয়া প্রশাসন তাই অধিকতর টিউশন ফি আরোপ করে পুনরায় আরেকটি নীতি গ্রহণ করে।
২রা ফেব্রুয়ারি, প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে ছাত্রদের বিক্ষোভ। ছবিঃ গোলাম মোস্তফা


আত্মমর্যাদাশীল ছাত্ররা টিউশন ফি প্রত্যাহার, সান্ধ্যকোর্স বাতিল চেয়ে ছাত্র বিক্ষোভের ডাক দেয়। যদিও প্রশাসন দুদফা ছাত্রদের সাথে বসতে আগ্রহী হয় কিন্তু পয়সার লোভ তারা উপেক্ষা করবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ছাত্র গণবিক্ষোভ বৃদ্ধি পেলে অতিরিক্ত টিউশন ফি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও শিক্ষার সওদাগিরি অব্যাহত থাকবে এরকম সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় তারা। বিপরীতে ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ থেকে দাবি আদায় ছাড়া আন্দোলন থেকে পিছু হটবেনা জানালে বেনিয়া প্রশাসন লাঠিচার্জের সিদ্ধান্ত নেয়। আজকের এই দিনে ২০১৪ সালে দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে চলমান ছাত্র আন্দোলনকে থামাতে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়। এবং পুলিশ, ছাত্রলীগের যৌথ হামলার মাধ্যমে ছাত্রদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দেয় প্রশাসন। পুনঃরায় আন্দোলন সংগঠিত করতে দেবেনা বিধায় সেদিন বিকেলেই অনির্দিষ্টকালের জন্যে ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়। পরদিন আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে সংগঠিত করতে যেসকল রাজনৈতিক সচেতন ছাত্ররা কাজ করেছিলো তাদের এক হাত দেখে নেয় আবারও। ছয়টা মামলা ঠুকে দেয় তাদের বিরুদ্ধে। সেসব মামলা আজ অবধি চলমান। তৎকালীন প্রশাসনের সেসব শিক্ষকদের ছাত্রবান্ধব শিক্ষক হিসেবে এক ধরণের সুনামও রয়েছে। তারা ছাত্রদের বিভিন্ন ইভেন্টে চাঁদা দেন, আতিথ্য গ্রহণ করেন, মিডিয়ার সামনে কথা বলেন। আবার ছাত্রদের দিকে বন্দুক তাক করবার নির্দেশও দেন।

ছবিতে বন্ধুক হাতে ছাত্রলীগ নেতা


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে পয়সার চেয়ে মর্যাদার মূল্য বেশি এই ধারণাকে তারা পৃষ্ঠ করে প্রমাণ করলেন, পয়সার লোভ তাদেরও আছে। আর সেই পথে কেউ অন্তঃরায় হলে তারাও আভিভূর্ত হতে পারেন সন্ত্রাসের চেহারায়। ২রা ফেব্রুয়ারিতে তাদের সন্ত্রাসী চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে। তাই দিবসটা তারা ভুলে যাবেন। কিন্তু ছাত্ররা সেটি স্মরণ করবেন যুগ যুগ ধরে। শিক্ষা রক্ষা দিবসের ৭ম বছরে এসে দিবসটিকে আমরা স্মরণ করতে চাই। ছাত্রদের সেদিনের সাহসী, সহিষ্ণু পদক্ষেপ আমাদের অনুপ্রাণিত করে শিক্ষা রক্ষার মিছিলে জোরসে স্লোগান দিতে। আজকের দিনে সেসব আহত ছাত্রদেরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জোরসে বলি, শিক্ষা ব্যবসা নিপাত যাক।